যদি টাইম মেশিন বলে সত্যিই কিছু থাকত, ফারুক আহমেদ হয়তো তাতে চড়ে ফিরে যেতে চাইতেন দেড়-দুই মাস আগে। বিপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজি নির্বাচনের টেবিলে বসে সিদ্ধান্ত নিতেন, এবার খেলা হবে পাঁচ ফ্র্যাঞ্চাইজির।
টাইম মেশিন এখনো আবিষ্কৃত হয়নি বলে সে উপায় নেই। এখন শুধু আফসোসই করা যায়—‘কেন বিপিএলে নতুন দুটি ফ্র্যাঞ্চাইজি নিতে গেলাম!’ এই দুই নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজির মধ্যে ঢাকা ক্যাপিটালস নিয়ে অবশ্য প্রকাশ্যে কোনো বিতর্ক নেই। আবার এটাও ঠিক, এক দুর্বার রাজশাহীই যত নেতিবাচক ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে, বিপিএলকে কলঙ্কিত করতে আর কারও কিছু না করলেও চলছে। আজ সর্বশেষ যোগ হয়েছে ‘বিশেষ ব্যবস্থা’য় তাদের শুধু স্থানীয় ক্রিকেটারদের নিয়ে ম্যাচ খেলার বিস্ময়কর ঘটনা। বিপিএলে এর আগে চার বিদেশির জায়গায় দুই বিদেশি নিয়ে খেলার নজির থাকলেও বিদেশি ছাড়া খেলার ঘটনা এটাই প্রথম।
বিস্ময়কর হলেও সত্যি, ৯ উইকেটে মাত্র ১১৯ রানের পুঁজি নিয়ে রংপুরের বিপক্ষে রাজশাহী ম্যাচটা জিতে গেছে ২ রানে। রাজশাহীর হয়ে সর্বোচ্চ অপরাজিত ২৮ রান করেন সানজামুল ইসলাম। তাড়া করতে নেমে ৩০ রানের মধ্যে ৬ উইকেট হারিয়ে ফেলা রংপুর রাইডার্সের হারটাই মনে হচ্ছিল ম্যাচের নিয়তি। তবে অষ্টম উইকেটে মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন ও রাকিবুল হাসানের জুটিতে আশা জাগায় রংপুর। শেষ ওভারে ২৫ রান দরকার ছিল রংপুরের। জিসান আলমকে মারা সাইফুদ্দিনের টানা দুই ছক্কায় সমীকরণ হয়ে যায় ৪ বলে ১৩ রানের। তবে পরের দুই বল ডট দিয়ে ম্যাচ হাতছাড়া করে ফেলেন সাইফুদ্দিন। শেষ দুই বলে ১০ রান নিয়েও তাই লাভ হয়নি আর। ২০ ওভারে ৮ উইকেটে ১১৭ রান করে থামে রংপুর। পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে থাকা রংপুরের বিপক্ষে এটি রাজশাহীর টানা দ্বিতীয় জয়।
মনে হতেই পারে, মাঠের বাইরে রাজশাহীর বিতর্কিত ঘটনা ঘটানো মানে মাঠে তাদের জয়! চট্টগ্রামে সিলেট স্ট্রাইকার্স আর রংপুরের বিপক্ষে ম্যাচেও কি সেটাই দেখা যায়নি!
আজ সন্ধ্যার আলোচিত এই ম্যাচের আগে রাজশাহীর বিদেশি ক্রিকেটাররা একরকম ‘ধর্মঘট’ই ডেকে বসেন। টাকা পাননি, তাই খেলবেন না। দলের সঙ্গে মাঠেও আসেননি। বিদেশি ক্রিকেটাররা না আসায় বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের টেকনিক্যাল কমিটির কাছে ফ্র্যাঞ্চাইজি কর্তৃপক্ষ শুধু স্থানীয় ক্রিকেটারদের নিয়ে ম্যাচ খেলার অনুমতি চায়। বিপিএলের প্লেয়িং কন্ডিশন অনুযায়ী যদিও প্রতি ম্যাচে অন্তত দুজন ও সর্বোচ্চ চারজন বিদেশি খেলানোর নিয়ম, ম্যাচটা হওয়ার স্বার্থে টেকনিক্যাল কমিটিকে সে নিয়মের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
বিসিবি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েই জানিয়েছে সিদ্ধান্তটা। তাতে বলা হয়, বিদেশি খেলোয়াড়দের পাওয়া যাচ্ছে না বলে দুর্বার রাজশাহী রংপুরের বিপক্ষে ম্যাচটি শুধু স্থানীয় ক্রিকেটারদের দিয়ে খেলানোর জন্য বিশেষ অনুমোদন চেয়েছে। ফ্র্যাঞ্চাইজির অনুরোধ পর্যালোচনা করে প্লেয়িং কন্ডিশনের ১.২.৮ ধারা অনুযায়ী টেকনিক্যাল কমিটি তাদের সে অনুমোদন দিয়েছে।
টেকনিক্যাল কমিটির প্রধান রকিবুল হাসানও প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘দুর্বার রাজশাহী জানিয়েছে, বিদেশি খেলোয়াড় নিয়ে তারা সমস্যায় আছে। সমস্যাটা কী, বলেনি। তারা আবেদন জানিয়েছে, এই ম্যাচটা তারা বিদেশি খেলোয়াড় ছাড়া খেলতে চায়। বিশেষ বিবেচনায় আমরা তাদের অনুমতি দিয়েছি। টুর্নামেন্টের বৃহত্তর স্বার্থে টেকনিক্যাল কমিটির সে এখতিয়ার আছে।’ তবে বিদেশি খেলোয়াড় খেলাতে না পারার যৌক্তিক কারণ ব্যাখ্যা না করেই রাজশাহী বিসিবির ‘বিশেষ বিবেচনা’ কীভাবে পেল, সেটা প্রশ্ন থেকেই যায়।
বিপিএলে এবার শুরু থেকেই বিতর্কিত সব কর্মকাণ্ডের কারণে দুর্বার রাজশাহী ‘দুর্বল রাজশাহী’ হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যায়। প্রথমত, ফ্র্যাঞ্চাইজিটির মালিকানা নিয়েই আছে সমস্যা। শফিকুর রহমানের মালিকানাধীন আবাসন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভ্যালেন্টাইন গ্রুপ এর মালিক হলেও মালিকানার দাবিদার নাকি আরও আছেন! যদিও অন্যান্য আলোচনার নিচে চাপা পড়ে গেছে এ আলোচনা।
দুর্বার রাজশাহীর খেলোয়াড়দের পাওনা না মেটানোর সমস্যা প্রথম প্রকাশ্যে আসে চট্টগ্রাম পর্বে। ১৭ জানুয়ারি চট্টগ্রামে তাদের প্রথম ম্যাচের এক দিন আগে খেলোয়াড়েরা প্রতিশ্রুত প্রথম ২৫ শতাংশ টাকা না পাওয়ার প্রতিবাদে অনুশীলন করেননি। পরদিন রাত থেকে ম্যাচের দিন সকাল পর্যন্ত খেলোয়াড়দের দাবি মোটামুটি মিটিয়ে ১৭ জানুয়ারি অন্তত ম্যাচটা খেলাতে পেরেছে তারা। এর পর থেকে তো রীতিমতো ধারাবাহিক নাটকই দেখিয়ে যাচ্ছে দুর্বার রাজশাহী—
• চট্টগ্রামে হোটেল বিলের তিন লাখ টাকার চেক বাউন্স করে। টাকা না দিলে হোটেল কর্তৃপক্ষ ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিককে যেতে দেবে না জানিয়ে দেয়। আটকে রাখা হয় তাঁর ব্যবহৃত গাড়িও।
• চট্টগ্রামেই বাকি ২৫ শতাংশ টাকার চেক না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠা খেলোয়াড়দের মাঠে নামাতে বিসিবি আশ্বস্ত করে, ফ্র্যাঞ্চাইজি টাকা না দিলে বোর্ড তাদের টাকা দেবে।
• দলের শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটার লাহিরু সামারাকুন বিসিবিতে নালিশ জানান, ফ্র্যাঞ্চাইজি তাঁকেও কোনো টাকা দেয়নি।
এসব নিয়ে নেতিবাচক আলোচনার মধ্যেই আজকের ঘটনা। তবে বিদেশিদের ম্যাচ বয়কটের আগে এদিন ঘটেছে আরেকটি ঘটনাও। হোটেল বদলাতে বাধ্য হয়েছে দুর্বার রাজশাহী দল। ঢাকায় তারা যে হোটেলে ছিল, চট্টগ্রামের মতো সেখানেও নাকি বকেয়া পরিশোধে সমস্যা হচ্ছিল। পরে হোটেল কর্তৃপক্ষ তাদের মালিকানাধীন অন্য একটি কম ভাড়ার হোটেলে থাকতে বলে রাজশাহী দলকে। সে হোটেলও আবার বর্তমানে চালু অবস্থায় নেই, সংস্কারকাজ চলছে তাতে।
শফিকুর রহমান অবশ্য শুরু থেকেই দাবি করছেন, খেলোয়াড়দের বকেয়া, হোটেল বিল—কোনো কিছু নিয়েই কোনো সমস্যা নেই। সব খবর ভিত্তিহীন। যদিও ফ্র্যাঞ্চাইজির ঘটানো একটার পর একটা অঘটনে উল্টো তাঁর কথার ভিত্তি খুঁজে পাওয়াটাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে মাঠের বাইরে তাদের ‘অঘটন’ মানেই যে মাঠেও তাদের অঘটন ঘটানো! আজকের আগে ১০ ম্যাচের ৪টিতে জিতেছিল রাজশাহী। এর মধ্যে ঠিক আগের ম্যাচেই হারিয়েছিল টানা আট ম্যাচে জেতা রংপুর রাইডার্সকে। প্লে-অফের আগে রাজশাহী বিদায় নিলে বিসিবি হয়তো একটু স্বস্তিই পেত। স্থানীয় ক্রিকেটারদের দ্বিতীয় দফার পাওনা ২৫ শতাংশের চেক দুর্বার রাজশাহী বিসিবির কাছে দিয়ে দেওয়ায় অন্তত খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক নিয়ে চিন্তাটাও একটু কমে এসেছিল। বাকি টাকা না দিলে প্রয়োজনে আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ারও সুযোগ আছে।
কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচে শক্তিশালী রংপুরকে হারিয়ে দিয়ে এখন তারা প্লে-অফের দৌড়েও আছে। জয় দিয়েই কি তাহলে কলঙ্ক ঘোচাবে দুর্বার রাজশাহী? নাকি প্রতিপক্ষের এসব হার থেকে ভবিষ্যতে মাথা তুলবে নতুন কোনো বিতর্ক!