দ্যা নিউ ভিশন

এপ্রিল ৪, ২০২৫ ০১:২৩

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক: নির্বাচনের রূপরেখা চায় বিএনপি

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিএনপির প্রতিনিধিদলের সাক্ষাৎ। গতকাল ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায়

দ্রুত নির্বাচন দিতে সরকারের ওপর চাপ তৈরি করেছে বিএনপি। নির্বাচনের রূপরেখা ঘোষণাসহ কিছু দাবিতে আগামীকাল বুধবার থেকে মাঠের কর্মসূচিতে যাচ্ছে দলটি। এই কর্মসূচি শুরুর আগে সরকারকে দ্রুত নির্বাচনের বিষয়ে তাগিদ দিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা। বৈঠকে নির্বাচন প্রশ্নে দলীয় অবস্থান ও মনোভাব প্রধান উপদেষ্টাকে জানিয়েছেন বিএনপির নেতারা।

এর আগে গত রোববার প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্য কমিশনারদের সঙ্গে বৈঠক করে বিএনপি। সেই বৈঠকে ইসির কাছে নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন নেতারা। সর্বশেষ গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে নির্বাচনসহ দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করল বিএনপি।

বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টাকে চার পৃষ্ঠার একটি লিখিত বক্তব্য দিয়েছে বিএনপি। বৈঠক শেষে রাত পৌনে আটটায় যমুনা প্রাঙ্গণে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, প্রধান উপদেষ্টা এবং তাঁর সঙ্গে যাঁরা ছিলেন তাঁরা আশ্বস্ত করেছেন, অতি দ্রুত নির্বাচনের ব্যবস্থা করছেন। তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) বলেছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের ব্যবস্থা করার জন্য কাজ করছেন। জনগণের প্রত্যাশা, অতি দ্রুত একটা রোডম্যাপ ঘোষণা করা হবে, যার মধ্য দিয়ে ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন সম্পন্ন হবে।

কবে নির্বাচনের রোডম্যাপ (পথনকশা) ঘোষণা করা হতে পারে, এমন এক প্রশ্নে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘এটা ওনারা ঠিক করবেন। তবে ওনারা সম্ভাব্য ১৫ তারিখের (ফেব্রুয়ারি) মধ্যেই কিছু একটা বলতে পারেন।’

ন্যূনতম সংস্কার সম্পন্ন করে আলোচনা এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচন দেওয়ার বিষয়ে বৈঠকে কথা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন মির্জা ফখরুল।

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে মির্জা ফখরুলের সঙ্গে আরও ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমদ ও হাফিজ উদ্দিন আহমদ। গতকাল সন্ধ্যা ছয়টায় তাঁরা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় পৌঁছান। বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। প্রায় দেড় ঘণ্টার এই বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্যসহ চলমান বিভিন্ন বিষয়ে কথা হয়।

দায়িত্বশীল সরকারি একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বিএনপি নেতাদের বৈঠকে জুলাই ঘোষণাপত্রের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

এ নিয়ে কয়েক দিনের মধ্যেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে বিএনপির আলোচনা হতে পারে। এ ছাড়া বিএনপিকে জানানো হয়েছে, ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ঐকমত্য গঠন কমিশনের প্রথম বৈঠক হবে। এই বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোকে ডাকা হবে। বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সংস্কারের পদক্ষেপগুলো ব্যাখ্যা করবেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।

বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, দলের নীতিনির্ধারণী নেতারা মনে করছেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রশ্নে আর কোনো রাখঢাক নেই। এ বিষয়ে সরকারপ্রধানকে দলীয় অবস্থান জানিয়েই তাঁরা কর্মসূচিতে যাচ্ছেন। ১২ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে সমাবেশ করবে বিএনপি। প্রথম দিনে লালমনিরহাট, ফেনী, সুনামগঞ্জ, পটুয়াখালীসহ ৯ জেলায় সমাবেশ হবে।

বিএনপির নেতারা বলছেন, নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো, নির্বাচনের রোডম্যাপ এবং ফ্যাসিবাদীদের নানা ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও কার্যত ‘নির্বাচনের রোডম্যাপের’ দাবিতেই সমাবেশ করা হচ্ছে।

৫ ফেব্রুয়ারি রাতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরসহ সারা দেশে আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির স্থায়ী কমিটি জরুরি সভা করে। এরপর তিন দিনের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করল বিএনপি। কিন্তু হঠাৎ কেন এই বৈঠক, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা আছে। কেউ কেউ বলছেন, এ ঘটনায় সরকার সমালোচনার মুখে পড়েছে। এই সময়টাকে বিএনপি নির্বাচনের রূপরেখা ঘোষণার প্রশ্নে সরকারের ওপর কৌশলে চাপ তৈরির একটা উপযুক্ত সময় মনে করেছে।

‘সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর দায় সরকার এড়াতে পারে না’

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর দায় সরকার এড়াতে পারে না। তিনি বলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে সার্বিক বিষয়ে দলের উদ্বেগের বিষয়গুলো প্রধান উপদেষ্টার কাছে তুলে ধরা হবে। একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে এটা বিএনপির দায়িত্ব। বিএনপি সেই দায়িত্ব পালন করেছে।

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িঘর ভাঙচুরের ঘটনাগুলোর ইঙ্গিত করে বিএনপির মহাসচিব বলেন, যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তার দায় সরকার এড়াতে পারে না। কারণ, সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন বাহিনীর সামনেই একের পর এক ঘটনা ঘটেছে। যার ফলে সার্বিকভাবে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যথেষ্ট বিপন্ন হয়েছে। ফ্যাসিবাদীরা এসব বিষয়ে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে।

মির্জা ফখরুল বলেন, প্রশাসনে যাঁরা ফ্যাসিবাদের দোসর ছিলেন, যাঁরা দেশের সম্পদ লুট করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ও পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। এ ছাড়া বিগত ১৫-১৬ বছরে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে করা মিথ্যা মামলাগুলো প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা দ্রব্যমূল্যের ব্যাপারে কথা বলেছি। এ সরকারের অন্যতম বড় ব্যর্থতা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা। তারা (সরকার) কাজ করছে বলে আমাদের জানিয়েছে।’

বিএনপির মহাসচিব জানান, বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টি এসেছে। বিএনপি বলেছে, বিশেষ অভিযান ‘ডেভিল হান্টে’ যেন কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার না হন।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে কোনোভাবেই একমত হব না। আগে জাতীয় নির্বাচন দিতে হবে। এর আগে কোনো নির্বাচন হবে না। এটা আগেও পরিষ্কার করে বলেছি।’

কোনো কোনো উপদেষ্টা ক্ষমতায় থেকে রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়ায় জড়িত লিখিত বক্তব্যেও বিএনপি প্রধান উপদেষ্টাকে বলেছে, বিদ্যমান ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য এই দেশ এবং দেশের মানুষের মূল চালিকা শক্তি। এই ঐক্য বজায় রেখে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। এই ঐক্যের চর্চাকে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত করতে হবে। এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না, যাতে ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য এবং গণ–ঐক্য বিনষ্ট হয় অথবা ঐক্যে ফাটল ধরে। সুতরাং অন্তর্বর্তী সরকারকে সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতার অবস্থান বজায় রাখতে হবে।

কোনো মহলের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের এজেন্ডা যেন সরকারের কর্মপরিকল্পনার অংশ না হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা বাঞ্ছনীয় বলে মনে করে বিএনপি।

বিএনপি বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো কোনো উপদেষ্টা ক্ষমতায় থেকে রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়ায় জড়িত রয়েছেন মর্মে জনমনে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করার নানা প্রকার লক্ষণ ক্রমেই প্রকাশ পাচ্ছে, যা দেশ ও গণতন্ত্রের জন্য মোটেই সুখকর নয়। তবে দলটি বলেছে, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী যথাযথ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যেকোনো দলের আত্মপ্রকাশকে বিএনপি স্বাগত জানাবে।

লিখিত বক্তব্যে বিএনপি বলেছে, হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বিতাড়িত পতিত পরাজিত পলাতক স্বৈরাচার এবং তার দোসরদের উসকানিমূলক আচরণ, জুলাই–আগস্টের রক্তক্ষয়ী ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থান সম্পর্কে অশালীন এবং আপত্তিকর বক্তব্য-মন্তব্য দেশের জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ এবং ক্রোধের জন্ম দিয়েছে। এরই ফলে অতি সম্প্রতি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পতিত স্বৈরাচারের স্মৃতি, মূর্তি, স্থাপনা ও নামফলকগুলো ভেঙে ফেলার মতো জনস্পৃহা দৃশ্যমান হয়েছে।

পতিত ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগ বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা করে যাচ্ছে বলে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করেছে বিএনপি। দলটি বলেছে, প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্রের সহায়তায় দেশের বাইরে থেকে ফ্যাসিস্ট হাসিনা এই তৎপরতা চালিয়েই যাবে। সুতরাং গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসা দরকার। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার গত ছয় মাসেও পলাতক স্বৈরাচার এবং তাদের দোসরদের আইনের আওতায় আনতে যথেষ্ট কার্যকর পদক্ষেপ জনসমক্ষে দৃশ্যমান করতে সফল হয়নি বলে জনমনে প্রতিভাত হয়েছে।

তবে প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছে বিএনপি।

Related News

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ

ছাত্রদলের অনুষ্ঠানে শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি, ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার আশা

ছাত্রশিবির, ছাত্রদলসহ যাঁরা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন, তাঁরা ঐক্যবদ্ধভাবে আগামী