নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারে দুই থেকে তিন মাস যথেষ্ট সময়, এই মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে তিনি আর সময় ক্ষেপণ না করে জনগণের নির্বাচিত সরকার আসার সুযোগ দিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
আজ রোববার দুপুরে এক আলোচনা সভায় এ বক্তব্য দেন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৮৯তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এই আলোচনা সভার আয়োজন করে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল। ‘শহীদ জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের ঘোষণাই মহান মুক্তিযুদ্ধের ধনী’ শীর্ষক এই আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
আলোচনা সভায় বিএনপি নেতা হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ছাত্র-জনতার সঙ্গে রাজনৈতিক দলের ঐক্য অনেক প্রয়োজন। আশা করি, এই ঐক্যের পথে কোনো বিবেধের প্রাচীর তুলে দেবেন না।’
হাফিজ উদ্দিন আহমদ মনে করেন, হাসিনা চলে যাওয়া মানে অর্ধেকের বেশি সংস্কার হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা না থাকলে আর সংস্কার করবে কী! শেখ হাসিনার সঙ্গে সঙ্গে অপসংস্কার বিদায় নিয়েছে। এখন সংস্কার করার ন্যায্য অধিকার হলো নির্বাচিত প্রতিনিধিদের। একটি নির্বাচিত সংসদ সংস্কার করবে। সেই সংসদ আসার সুযোগ করে দেন। শুধু শুধু আর সময় ক্ষেপণ করবেন না।’
অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশে হাফিজ উদ্দিন আরও বলেন, ‘এই কয়েক মাসে বোঝা গেছে আপনাদের দৌড় কতটুকু। আমরা তারপরও আপনাদের সম্মান করি। আমরা সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐক্য চাই। বিশেষ করে ছাত্র–জনতার সঙ্গে রাজনৈতিক দলের ঐক্য অনেক প্রয়োজন। আশা করি, এই ঐক্যের পথে কোনো বিবেধের প্রাচীর তুলে দেবেন না। নির্বাচনী ব্যবস্থায় যতটুকু সংস্কার প্রয়োজন, তার জন্য দুই–তিন মাস সময়ই যথেষ্ট। সুতরাং আর সময় ক্ষেপণ না করে জনগণের নির্বাচিত সরকার আসার সুযোগ দেন।’
‘কিংস পার্টি করবেন না’
নির্বাচিত সরকার না থাকায় ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করতে হয়েছে জানিয়ে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আবারও কেন নির্বাচিত সরকারের জন্য আমাদের দেনদরবার করতে হবে। মনে হয় আমরা নির্বাচনের কথা বললে উপদেষ্টাদের মুখ কালো হয়ে যায়। মনে হচ্ছে আমরা অন্যায় দাবি করছি। আমরা তো অন্যায় দাবি করছি না। বিএনপিকে ক্ষমতায় বসান, সেটাও বলছি না। তবে এটা অবশ্যই বলব, কিংস পার্টি গঠন করবেন না।’
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘যারা রাজনীতি করতে চায়, এই সরকার থেকে পদত্যাগ করে বাইরে গিয়ে তারা দল গঠন করুক। তারা যেহেতু এত কিছুই পারে, শেখ হাসিনার মতো দুঃশাসনের নেত্রীকে তারা বিদায় করতে পারে, তাহলে আগামী দিনে জনগণ নিশ্চয়ই হয়তো তাদের ভোট দেবে। এই আশায় তাঁরা থাকতে পারেন। আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। অতি দ্রুত নির্বাচন চাই।’
এই সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের অধিকাংশ সদস্য জুলাই-আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করেন না বলে মন্তব্য করেন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘এঁদের মধ্যে দু–একজন ছাড়া এমন কোনো উপদেষ্টা নাই, যিনি একটা স্ট্যাটাস দিয়েছেন শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে। একটা কথা বলেছেন মিডিয়াতে দুঃশাসনের বিরুদ্ধে, খুঁজে পাওয়া যাবে না।’
অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ভুলে যাবেন না আপনাদের প্রধান কাজ হলো সুষ্ঠু নির্বাচন দেওয়া এবং ক্ষমতা হস্তান্তর করা। কিন্তু এই কথা তারা ভুলে গিয়েছে।’
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, ‘অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল তিন মাসের জন্য। আপনারা (অন্তর্বর্তী সরকার) তো ৩০ বছর থাকতে চান, যা মনে হচ্ছে। এত দিন সময় দেওয়া এখন আর সম্ভব হবে না। কারণ, অনির্বাচিত সরকার একটি দুর্বল সরকার। নির্বাচিত সরকার যেমনই হোক, তারা জনগণের সমর্থন নিয়ে আসে ক্ষমতায়। পরে যদি ভালোভাবে রাষ্ট্র চালাতে পারে থাকবে, রাষ্ট্র চালাতে না পারলে গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাদের বিদায় করে দিয়েন। কিন্তু প্লিজ গণতন্ত্রকে অবহেলা করবেন না। জনগণের রায়ের ওপর আস্থা থাকতে হবে।’
সরকারের উদ্দেশে হাফিজ উদ্দিন আহমদ এ–ও বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হবে নিরপেক্ষতা। তারা সবাইকে সমান নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখবেন। এখানে বসে কিংস পার্টি গঠন করার চেষ্টা আপনারা করবেন না। অধ্যাপক ইউনূস অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তাঁর সাফল্য আমরা দেখতে পারছি না। তবু আমরা তাঁকে সমর্থন জানাব।’
‘খোঁচা দিয়ে কথা বলা দুঃখজনক’
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘১৭ বছর সংগ্রাম করার পর পরশ্রীকাতরতা থেকে যখন বিএনপি সম্পর্কে সমালোচনা শুনি, তখন কষ্ট লাগে। বিশেষ করে যারা বয়সে এত কম। অধ্যাপক ইউনূস, আসিফ নজরুল বা অন্যান্য উপদেষ্টা যাঁদের যথেষ্ট বয়স হয়েছে, যাঁরা পরীক্ষিত, তাঁরা একটা কথা বললে মানায়। কিন্তু নাতির বয়সী একটা ছেলে যদি বিএনপি মহাসচিবের বিরুদ্ধে খোঁচা দিয়ে কথা বলে, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা এটা আশা করি না।’
সীমান্ত প্রসঙ্গ তুলে বিএনপি নেতা হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এখন সীমান্তে আবার প্রতিবেশী দেশ গন্ডগোল শুরু করেছে। তাদের পছন্দের নেত্রী বিদায় হয়েছে। তাদেরও গাত্রজ্বালা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের ফসল কেটে নিয়ে যান, আমগাছ কেটে নিয়ে যান। নানাভাবে প্রতিদিন গুলি করে মানুষ হত্যা করছেন। ভুলে যাবেন না যুদ্ধ করে এ দেশ স্বাধীন করেছি। যদি প্রয়োজন হয় আবারও যুদ্ধের ময়দানে যাব।’
জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খানের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আবদুস সালাম, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন, ফজলুল রহমান প্রমুখ। সভায় সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত।