দেড় কেজি ওজনের প্রতিটি ফুলকপি ও বাঁধাকপি পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে আড়াই থেকে তিন টাকায়। চাষাবাদের খরচ তো দূরের কথা; খেত থেকে সবজি ওঠানো ও বাজারে নেওয়ার খরচও তুলতে পারছেন না কৃষকেরা। কপি চাষ করে নিশ্চিত লোকসানে তাঁরা বুক চাপড়াচ্ছেন। খেতে রেখে দিলে নষ্ট হচ্ছে ফুলকপি-বাঁধাকপি। তাই কৃষকের গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে শীতকালীন এই সবজি।
গতকাল সোমবার ও আজ মঙ্গলবার রংপুরের বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জের হাটবাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, পাইকারি বাজারে প্রতিটি ফুলকপি-বাঁধাকপির দাম তিন টাকার মধ্যে। খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে চার থেকে পাঁচ টাকায়। এরপরও ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না।
কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবার বাজারে সরবরাহ বেশি ও অন্য সবজির দাম কমে যাওয়ায় ফুলকপি ও বাঁধাকপির বাজারে ধস নেমেছে। অতীতে কখনো এত কম দামে তা বিক্রি হয়নি। গত বছর মৌসুমের শেষ পর্যন্ত ফুলকপি ও বাঁধাকপি গড়ে ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছিলেন কৃষকেরা। কিন্তু এবার চিত্র একেবারেই উল্টো।
তারাগঞ্জের হাজীপুর গ্রামের কৃষক মোকছেদুল ইসলাম এবার ৩০ শতক জমিতে বাঁধাকপি চাষ করেছিলেন। এখন পর্যন্ত খরচ হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, ‘গতবার বাঁধাকপি চাষ করি দুইটা টাকা পাচনো। এবার তাক নাগেয়া মাটোতে মরি গেছি। আইজ সকালে গাছ থাকি ৩০০ কপি কাটতে খরচ পলছে ৪৫০ টাকা। ভ্যানোত করি বাজারোত আনতে ভাড়া নিছে ৪০০ টাকা। তাক সকালে দাম করছেল ৭০০ টাকা। জোহরের পর কপি আর কাঁয়ও নাড়ে নাই। বেচা না হওয়ায় তা গরুক খিলবার জন্য বাড়িত নিয়া যাওচি।’

দেড় কেজি ওজনের প্রতিটি ফুলকপি পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে আড়াই থেকে তিন টাকায়। চাষাবাদের খরচ তো দূরের কথা; বাজারে নেওয়ার খরচও তুলতে পারছেন না কৃষকেরা
উপজেলার মেনানগর গ্রামের কৃষক মজনু মিয়া ৫০ শতকে ফুলকপি চাষ করেছেন। খরচ হয়েছে প্রায় অর্ধলাখ টাকা। ফুলকপির ফলন ভালো হলেও দাম না থাকায় বাজারে নেওয়ার সাহস পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, ‘হিসাব করি দ্যাকোচি, আবাদের খরচ ওঠা তো দূরের কথা; গাছ থাকিয়া কপি কাটা ও বাজারোত নিয়া যাওয়ার ভ্যান খরচও উঠপের নেয়। ভূঁইয়োতে কপি নষ্ট হয়চে। গতবার মানুষ কপির ডান্টাও (ডগা) খাইচে, এবার ফুলও খাওচে না।’
বদরগঞ্জের মধুপুর ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের মনমোহন সিংহ, উত্তরবাওচন্ডি শাহপাড়া গ্রামের অনিল চন্দ্র রায়, নিমাই চন্দ্র ও ধীরেন্দ্র নাথ রায় এবার ফুলকপির চাষ করে বুক চাপড়াচ্ছেন। অনিল চন্দ্র বলেন, ৪০ শতকে ফুলকপি চাষ করতে খরচ পড়েছে ৩২ হাজার টাকা। এখন পর্যন্ত কপি বেচেছেন সাত হাজার টাকার। গাছেই কপি নষ্ট হচ্ছে। এবার পুরোটাই লোকসান।
সকালে বদরগঞ্জ বাজারে সবজি কিনছিলেন ফাটকেরডাঙা গ্রামের রিকশাচালক সমছের আলী (৫২)। বলেন, ‘সবজি এবার পানির দামোত বিক্রি হওচে। কিনি খায়া আরাম পাওচি। বাজারোত ফুলকপি আর বাঁধাকপিতে ভরি গেইচে। এ্যালা কপি খাবার মোনায় না।’
বাজারের সবজি বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, এবার বাঁধাকপি-ফুলকপিসহ সবজিতে বাজার ভরা। সরবরাহ বেশি হওয়ায় দাম খুব কম। এক মাস আগে ফুলকপি বিক্রি করেছেন ১০০ টাকা কেজি। এখন দেড় কেজি ওজনের কপি প্রতিটি তিন টাকায় কিনে পাঁচ টাকায় বিক্রি করছেন। তবু মানুষ কিনছে না।

তারাগঞ্জ বাজারে বাঁধাকপি বিক্রি না হওয়ায় বসে আছেন কৃষক মোকছেদুল হক। মঙ্গলবার বিকেলে
গত দুই দিন বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জের বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে দেখা গেল, প্রতি কেজি আলু পাইকারি বাজারে ৯ থেকে ১১ টাকা, শিম ১২ থেকে ১৪ টাকা, বেগুন ১৪ থেকে ১৫ টাকা, টমেটো ১৫ থেকে ১৮ টাকা, গাজর ১৮ থেকে ২০ টাকা ও শসা ১৫ থেকে ১৭ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে দাম একটু বেশি।
উপজেলা কৃষি কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অক্টোবর-নভেম্বরে ফুলকপি ও বাঁধাকপি জমিতে লাগাতে হয়। এবার বদরগঞ্জে ফুলকপি ও বাঁধাকপির চাষ হয়েছে প্রায় ৬০০ হেক্টরে। গতবার চাষ হয়েছিল ৪৫০ হেক্টরে। তারাগঞ্জে গতবার চাষ হয়েছিল ১০০ হেক্টরে। এবারে চাষ হয়েছে ১৫০ হেক্টরে।
তারাগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীবা রাণী রায় প্রথম আলোকে বলেন, কৃষি বিভাগের তদারকি ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার ফুলকপি, বাঁধাকপিসহ সবজির বাম্পার ফলন হয়েছে। বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে চাষিরা দাম না পেয়ে হতাশ হচ্ছেন। ভবিষ্যতে আবাদের ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।