দ্যা নিউ ভিশন

এপ্রিল ৩, ২০২৫ ১০:৩৬

কেমন ছিল এবারের রোবট অলিম্পিয়াড

বাংলাদেশ দলের ১০ সদস্য

আরিয়েত্তি ইসলাম যখন সমস্যা সমাধানে মগ্ন, বারবারই এসে ওকে দেখে যাচ্ছিলেন রেফারিরা, ছবি তুলছিলেন। মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের এই শিক্ষার্থীর প্রতি তাঁদের এই অতি আগ্রহের কারণও অবশ্য ছিল, ওর বয়স যে মোটে আট বছর। এত ছোট্ট একজন মানুষ নিজে নিজেই আরডুইনো দিয়ে রোবট বানাচ্ছে, কোড তৈরি করছে, দেখে রেফারিরাও মুগ্ধ!

বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে কম বয়সী প্রতিযোগী ও, তাই দুশ্চিন্তা হচ্ছিল, ভুল করে কোনো নিয়ম না ভেঙে ফেলে আরিয়েত্তি! ভুল তো করেইনি, উল্টো জুনিয়র গ্রুপ থেকে স্বর্ণপদক জিতে নিয়েছে আরিয়েত্তি। কিন্তু পদকের চেয়েও বড় প্রাপ্তি সম্ভবত রেফারিদের ওই মুগ্ধতা। ১৭-২০ জানুয়ারি দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান শহরে বসেছিল ২৬তম আন্তর্জাতিক রোবট অলিম্পিয়াডের আসর। প্রতিযোগিতায় ২টি স্বর্ণ, ৪টি রৌপ্য ও ৪টি ব্রোঞ্জ জিতেছে বাংলাদেশ দল।

কেমন ছিল এবারের আয়োজন

বুসান এক্সিবিশন অ্যান্ড কনভেনশন সেন্টারে এক হয়েছিল ২৬টি দেশের অনূর্ধ্ব ১৮ বছর বয়সী শিশু-কিশোরেরা। বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ভেন্যু হিসেবেই জায়গাটা বেশি পরিচিত। সেখানে রোবটিকসের মাধ্যমে হাতে–কলমে বুসানের শিল্প, সংস্কৃতি ও পর্যটনবিষয়ক নানা সমস্যার সমাধান খুঁজেছে প্রতিযোগীরা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছিল বিভিন্ন রোবট প্রদর্শনী, অগমেন্টেড রিয়েলিটি চাক্ষুষ করার সুযোগ। বুসানের নানা দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা, বিভিন্ন দেশের নতুন বন্ধু তৈরি, এসবও আয়োজনের অংশ। শুধু আয়োজকেরাই নন, বুসানের সাধারণ মানুষকেও মনে হয়েছে বেশ আন্তরিক। প্রতিযোগীদের বরণ করে নিয়েছেন সবাই। মুসলমানদের জন্য আলাদা করে হালাল খাবার ও নামাজের জায়গার ব্যবস্থা রেখেছিলেন তাঁরা।

প্রতিযোগিতার নিয়মকানুন

প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট থিম থাকে। এ বছর থিম ছিল ‘সাগরতলের ভবিষ্যৎ বুসান শহর: শিল্প, পর্যটন ও সংস্কৃতি।’

এই থিমের ওপর ভিত্তি করেই প্রতিযোগীদের দেওয়া হয় বিভিন্ন সমস্যা সমাধান। যেমন একটি সমস্যা ছিল—সামুদ্রিক কৃষিপণ্য উৎপাদন। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য হাতে–কলমে রোবট তৈরি করে বিচারকদের দেখাতে হয়। প্রতিযোগিতার আবার বিভিন্ন ক্যাটাগরি থাকে। কিছু ক্যাটাগরিতে বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে হয়। আবার কিছু ক্যাটাগরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন লক্ষ্য সম্পন্ন করতে হয়।

বাংলাদেশ দলের ১০ সদস্য: মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের আরিয়েত্তি ইসলাম, মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নাফিয়া বাসার, স্কলাস্টিকার প্রিয়ন্তী দাস, নটর ডেম কলেজের মিসবাহ উদ্দিন, উইলিয়াম কেরি একাডেমির জাইমা যাহিন ওয়ারা, ওয়াইডব্লিউসিএ উচ্চমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের নুসাইবা তাজরিন, হার্ডকো ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের নামিয়া রওজাত এবং ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের হাসিন ইশরাক চৌধুরী, এ জেড এম ইমতেনান কবির ও আবরার আবির।

অনুপ্রেরণার ঝুলি

অন্যান্য দেশের অনেক প্রতিযোগীকে দেখে মনে হলো, খুব অল্প বয়স থেকেই তারা নানা রকম যন্ত্র বা রোবট তৈরির শিক্ষা হাতে-কলমে নিয়ে ফেলে। এমন অনেক যন্ত্রপাতিও তাদের হাতে দেখলাম, যেগুলো বাংলাদেশে পাওয়াই যায় না। তাই ওদের তৈরি রোবটগুলোও দেখতে বেশ সুন্দর। এদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অত্যাধুনিক বুসান শহরের উপযোগী রোবট তৈরির কাজটা তাই আমাদের প্রতিযোগীদের জন্য বেশ কঠিনই ছিল। প্রথম দিনে শিক্ষার্থীরা বেশ বেগ পেয়েছে। পানির নিচের হোটেল, দেয়ালসহ নানা স্থাপত্য তৈরি, সাবমেরিন পরিচালনার উপযোগী রোবট নিয়েও কাজ করতে হয়েছে। শুরুতে কঠিন মনে হলেও দ্বিতীয় দিন থেকে আমাদের দল আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে।

চতুর্থ দিনে কোনো প্রতিযোগিতা ছিল না। সারা দিন ঘুরে ঘুরে আমরা বুসানের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান, প্রযুক্তি ও স্থাপত্য দেখেছি। এসবের মধ্য দিয়েই ভিনদেশি প্রতিযোগীদের সঙ্গে আমাদের ছেলেমেয়েদের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। সমাপনী অনুষ্ঠানে কোরিয়ান নাচ, তায়কোয়ান্দোর পরিবেশনাও ছিল চমকপ্রদ। তবে সব ছাপিয়ে গেছে ১০টি পদক অর্জনের আনন্দ।

এবারে সবচেয়ে ভালো ফল করেছে স্বাগতিক দেশ কোরিয়া ও নিউজিল্যান্ড। ওদের দেশের শিশুরা সারা বছরই নানা রকম রোবট তৈরি ও রোবটিকসের চর্চা করে। মূল থিম পাওয়ার পর থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল তাদের গবেষণা। পাশাপাশি সময়ানুবর্তিতার প্রতিও ওদের বেশ ঝোঁক আছে মনে হলো। আমাদের ছেলেমেয়েরাও এসব দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছে।

প্রতিবছর বাংলাদেশের ধারাবাহিক সাফল্য দেখে অনেকেই বিস্মিত। যেমন নিউজিল্যান্ডের মেন্টর জানালেন, তাঁরা আমাদের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন। বিশেষ করে ‘ক্রিয়েটিভ মুভি’ ক্যাটাগরিতে আমাদের ধারাবাহিক সাফল্যের বেশ প্রশংসা করছিলেন তিনি। সব মিলিয়ে এই অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের একটা পরিচিতি দাঁড়িয়ে গেছে। ভবিষ্যতেও এই সুনাম ধরে রাখাই হবে শিক্ষার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

লেখক: প্রধান রোবোটিকস কোচ ও কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টিটিভ, বাংলাদেশ রোবট অলিম্পিয়াড

Related News

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ

ছাত্রদলের অনুষ্ঠানে শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি, ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার আশা

ছাত্রশিবির, ছাত্রদলসহ যাঁরা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন, তাঁরা ঐক্যবদ্ধভাবে আগামী