দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার পেছনে জিনগত প্রভাব, অভ্যাস, জীবনযাপন পদ্ধতি, পরিবেশ ইত্যাদি অনেক বিষয় থাকে। ‘দ্য লংজিভিটি প্রজেক্ট’ বইয়ের লেখক, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অধ্যাপক ডা. হাওয়ার্ড ফ্রেডম্যান সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের শতবর্ষী জীবনের বেশ কিছু কারণ জানিয়েছেন। জেনে নেওয়া যাক, যে ৬ অভ্যাস জিমি কার্টারকে দীর্ঘজীবী করেছে।
গত ১ অক্টোবর শততম জন্মদিন পালন করেন সদ্য প্রয়াত মার্কিন প্রেসিডেন্ট, শান্তিতে নোবেলজয়ী জিমি কার্টার। নব্বইয়ের পরও ছিলেন শারীরিকভাবে কর্মক্ষম। স্থানীয় সময় গতকাল রোববার বিকেলে জর্জিয়ার প্লেইনসে নিজ বাড়িতে মারা গেছেন জিমি। তাঁর বয়স হয়েছিল ১০০ বছর। ২০২৩ সালের নভেম্বরে মারা যান তাঁর স্ত্রী রোজালিন কার্টার। সেবারই শেষবারের মতো তাঁকে দেখা গিয়েছিল জনসমক্ষে।
হসপিস কেয়ারের পরও জিমি কার্টার এত দিন বাঁচলেন কীভাবে
হসপিস কেয়ার কাজ করে মূলত নিশ্চিত মৃত্যুপথযাত্রীদের ব্যথা বা কষ্ট নিরাময়, তাঁদের বিশেষ যত্ন ও শারীরিক, মানসিক, আত্মিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে। হসপিস কেয়ারে থাকা মানুষেরা সাধারণত ৪-৬ মাসের বেশি বাঁচেন না। কেউ প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর যখন আর নিরাময়ের কোনো উপায় থাকে না, কেবল তখনই হসপিস কেয়ারের আওতায় আনা হয়।
প্রায় ১০ বছর আগে, ২০১৫ সালের আগস্টে ক্যানসারে আক্রান্ত হন জিমি কার্টার। প্রথমে সেটি ধরা পড়ে লিভারে। সেখানে বড় আকৃতির একটি টিউমার পাওয়া যায়। অস্ত্রোপচার করে টিউমার অপসারণ করার পর জানা যায়, খুবই বিপজ্জনক ও মারাত্মক ধরনের ত্বকের ক্যানসার মেলানোমায় আক্রান্ত তিনি। আর তা ধরা পড়ার আগেই ছড়িয়ে পড়েছিল মস্তিষ্কের চার জায়গায়। শেষ ধাপের মেলানোমায় আক্রান্ত হয়ে গত এক দশক চলেছে চিকিৎসা আর ১৯ মাস ধরে তিনি হাসপাতালেই ভর্তি ছিলেন। ২০১৯ সালে বেশ কয়েকবার পড়ে গিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানের হাড় ভেঙে গিয়েছিল জিমির। ফলে আরও কয়েকবার অস্ত্রোপচার করতে হয়।
১. মানবিক কাজ
জিমি কার্টার ও তাঁর স্ত্রী শেষ বয়সে নিজেদের বিভিন্ন মানবিক কাজে যুক্ত রেখেছিলেন। তাঁদের প্রতিষ্ঠান বিশ্বের ১৪টি দেশে ৪ হাজার ৩০০টি পরিবারের বাড়ি তৈরি করে দিয়েছে। ১৯৮৪ সাল থেকেই তাঁরা ‘হ্যাবিট্যাট ফর হিউম্যানিটি’সহ বিভিন্ন দাতব্য সংস্থার সঙ্গে কাজ করেছেন। সাবেক এই প্রেসিডেন্ট একাধিকবার জানিয়েছেন, সমাজসেবামূলক কাজ তাঁকে শান্তি দেয়।
২. নতুন কিছু শেখা, নতুন চ্যালেঞ্জ
‘হোয়াট মেকস আ ম্যারেজ লাস্ট’ বইয়ের সাক্ষাৎকারে জিমি কার্টারের স্ত্রী রোজালিন কার্টার বলেন, ‘জিমি যখন “ডাউনহিল স্কি” শেখে, তখন তার বয়স ৬২। জিমি কেবল নতুন নতুন দক্ষতা অর্জনেই ক্ষান্ত দেয়নি, বরং সে সেসবের অনুশীলন করত।’ নতুন কিছু শেখার আনন্দ, দক্ষতা, নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়ানো—এসব মানুষকে দীর্ঘদিন বাঁচতে সাহায্য করে।
৩. শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধন
কার্টার ও তাঁর স্ত্রী ৭৭ বছর ধরে দাম্পত্য সম্পর্কে ছিলেন। ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর রোজালিনের মৃত্যুর পর কার্টার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘রোজালিন ছিল সবকিছুতেই আমার সমান অংশীদার। জানতাম, আমার পাশে এমন একজন আছে, যে আমাকে ভালোবাসে আর যে আমার সবকিছুতেই সমর্থন করবে, পাশে থাকবে।’ রোজালিনের মৃত্যুর পর এই দম্পতির কন্যা অ্যামি কার্টার মায়ের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে একটা চিঠি পড়ে শোনান। চিঠিটি জিমি কার্টার তাঁর স্ত্রীকে লিখেছিলেন ৭৫ বছর আগে। সেখানে জিমি লিখেছিলেন, ‘প্রতিবার আমি যখন তোমাকে রেখে দূরে কোথাও যাই, ফিরি এসে নতুন নতুনভাবে আবিষ্কার করি, তুমি কী দুর্দান্ত, অসাধারণ একজন। তোমাকে দেখে নতুন করে তোমার প্রেমে পড়ি।’
৪. নিয়মিত ব্যায়াম
৮০ বছর বয়স পর্যন্ত জিমি নিয়মিত দৌড়াতেন। তারপর হাঁটুব্যথার কারণে দৌড়ের বদলে নিয়মিত সাঁতার কাটতেন আর হাঁটতেন। ২০১৩ ও ২০১৮ সালে ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জিমি এ কথা জানান। জিমি ও তাঁর স্ত্রী সাইকেল চালিয়ে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতেন। এ ছাড়া দুজন মিলে বাড়ির আঙিনায় কৃষিকাজ করতেন। জিমির খাদ্যাভ্যাস ছিল খুবই স্বাস্থ্যকর। কখনো ধূমপান করেননি। স্কুলজীবনের এই তারকা বাস্কেটবল খেলোয়াড়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে ছিলেন বাদামচাষি।
৫. স্বতঃস্ফূর্ত বহির্মুখী ব্যক্তিত্ব, ফুরফুরে মেজাজ
জিমি সত্যিকারের পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তাঁর কজন ভালো বন্ধু ছিল। দাম্পত্য সম্পর্কে সুখী ছিলেন। ফলে জীবনের খুব কম সময়ই তাঁকে একাকিত্বে ভুগতে হয়েছে। হতাশা, মানসিক চাপ সহজেই কাটিয়ে উঠেছেন। তিনি ছিলেন প্রাণশক্তিতে উজ্জীবিত, বন্ধুভাবাপন্ন ও সহানুভূতিশীল।
৬. মানসিক শক্তি, স্পৃহা
জিমি কার্টার ছিলেন মানসিক শক্তিতে উজ্জীবিত। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে ও পরে বেশ কিছু সংকট ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন। বেশ কয়েকবার স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছেন। সবকিছুর ভেতরে তিনি কেবল শান্তি খুঁজেছেন। তাঁর মানসিক শক্তি, ইতিবাচকতা, প্রাণোচ্ছলতা, সহনশীলতা তাঁকে শতবর্ষী মার্কিন প্রেসিডেন্ট বানিয়েছেন।
সূত্র: টুডে ডটকম