মেরুদণ্ড একে অপরের সঙ্গে যুক্ত অবস্থাতেই পৃথিবীতে আসে নাফিসা আলিয়া নূহা এবং নাফিয়া আলিয়া নাবা। তাদের শরীরের পিছন ও নিচের অংশ জোড়া ছিল। এই দুই বোনকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি দল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আলাদা করেন। ২৫ নভেম্বর, প্রায় ৩২ মাস পর, তারা তাদের পরিবারের সঙ্গে বাড়ি ফিরে যান। এই দীর্ঘ যাত্রার গল্প লিখেছেন রাফিয়া আলম, যিনি প্রথম ২০২২ সালে কুড়িগ্রামে গিয়েছিলেন একটি বৈজ্ঞানিক সভায়। সেখানে তিনি জানতে পারেন সদ্য জন্ম নেওয়া জোড়া লাগা শিশুদের কথা এবং তাদের অস্ত্রোপচারের জন্য সহযোগিতা করতে অনুরোধ পান।
পরে, তিনি শিশু দুটি দেখতে কুড়িগ্রাম ক্লিনিকে যান। শিশু দুটি জন্মগতভাবে শরীরের পেছন ও নিচের অংশে জোড়া ছিল। উন্নত চিকিৎসার তেমন কোনো সুবিধা ছিল না, তবে সেখানকার চিকিৎসকরা অবিশ্বাস্যভাবে শিশু দুটিকে সুস্থ করে তোলার জন্য অস্ত্রোপচার করেছিলেন। শিশুর বাবা একজন পরিবহন শ্রমিক, মা গৃহিণী, এবং তাদের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়ে, রাফিয়া আলম তাদের বিএসএমএমইউতে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
তদন্তে জানা গেল, শিশু দুটির মেরুদণ্ড এবং স্পাইনাল কর্ড জোড়া রয়েছে। এই ধরনের যমজ শিশুদের বলা হয় ‘কনজয়েন্ট টুইন পিগোপেগাস’। তাদের অস্ত্রোপচার অত্যন্ত জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। স্পাইনাল কর্ডের আঘাত থেকে এদের শারীরিক অনুভূতি এবং অন্যান্য শারীরিক কার্যাবলী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অস্ত্রোপচার চলাকালে শিশু দুটি আরও ঝুঁকির মধ্যে ছিল, কারণ তাদের হৃদপিণ্ডে জন্মগত ছিদ্র ছিল।
একাধিক আন্তর্জাতিক স্পাইনাল নিউরোসার্জনের সঙ্গে আলোচনা করে, রাফিয়া আলম নিশ্চিত হন যে, বাংলাদেশেই অস্ত্রোপচার সম্ভব। সব ঝুঁকি মাথায় রেখে প্রস্তুতি শুরু হয়। শিশু দুটি বড় হওয়ার পর, ১৯ ফেব্রুয়ারি, অস্ত্রোপচার শুরু হয়, যার জন্য প্রায় ১০০ চিকিৎসক অংশ নেন, ৩৯ জনই বিশেষজ্ঞ। অস্ত্রোপচারের সময় মোট ১৫ ঘণ্টা ছিল। পায়ুপথের পৃথক ব্যবস্থা, রক্তনালির সুরক্ষা, স্পাইনাল কর্ড আলাদা করা—এ সবই ছিল অত্যন্ত জটিল কাজ।
অস্ত্রোপচারের পর শিশু দুটি নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ছিল, এবং কিছু সময় পরে তারা স্বাভাবিকভাবে হাত-পা নড়াচড়া শুরু করে। চিকিৎসকরা এ সময় অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে ওঠেন। কিছুদিন পর, শিশুটি কেবিনে স্থানান্তরিত হয় এবং ধীরে ধীরে হাঁটতে শেখে। তাদের মধ্যে খুনসুটি চলতে থাকে।
এই অস্ত্রোপচার দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এটি শুধুমাত্র একজন চিকিৎসকের সাফল্য নয়, বরং নিউরোসার্জন, শিশু সার্জন, প্লাস্টিক সার্জন, ইউরোলজিস্টসহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফল। শিশু দুটি এখন স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে এবং তাদের পরবর্তী চিকিৎসার দায়িত্ব বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ নিয়েছেন।
১৪ দিন বয়সে শিশু দুটি বিএসএমএমইউতে ভর্তি হয়েছিল, এবং ২ বছর ৭ মাস ২২ দিন পর তারা হাসিমুখে বাড়ি ফিরেছে। তারা এখন অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠছে, এবং চিকিৎসক হিসেবে এই অভিজ্ঞতা রাফিয়া আলমের জীবনে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।