মারা গেছেন জাহিদুর রহিম অঞ্জন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। গত সোমবার রাত সাড়ে আটটায় ভারতের বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী এই পরিচালক। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬১ বছর। তিনি স্ত্রী কথাসাহিত্যিক শাহীন আখতার, দুই ভাই, এক বোন ও অসংখ্য বন্ধু-স্বজন রেখে গেছেন। জাহিদুর রহিম অঞ্জন ভাষাসৈনিক মিজানুর রহিমের সন্তান। ১৯৬০ সালের ২৭ নভেম্বর ফরিদপুরের রাজবাড়ীতে তাঁর জন্ম। প্রয়াত এ নির্মাতার স্মরণে লিখেছেন তাঁর বন্ধু নির্মাতা গিয়াস উদ্দিন সেলিম।
অঞ্জন তখন জাদুঘরের চাকরি ছেড়ে বোহেমিয়ান জীবনযাপন করছে। আমাদের ধানমন্ডির অফিসে তখন আড্ডার সঙ্গে সঙ্গে থাকা–খাওয়ারও সুবন্দোবস্ত ছিল। অঞ্জন থেকে গেল অফিসে, দিনের পর দিন আড্ডা চলতে থাকল। তারেক শাহরিয়ার, পুলক গুপ্ত, আদিত্য কবির, নূরুল আলম আতিক, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, আকরাম খানসহ তখনকার সময়ের তুর্কি তরুণেরা এই আড্ডার নিয়মিত সদস্য। আড্ডার মূল বিষয় চলচ্চিত্র। আকিরা কুরোসাওয়া, তারকোভ্স্কি, ব্রেসোঁ, কিম কি–দুক, আব্বাস কিয়ারোস্তামি, মজিদ মাজেদি, সত্যজিৎ, ঋত্বিক হয়ে আদুর গোপালকৃষ্ণন পর্যন্ত ঠেকত। এই যে আমার সিনেমার বিশ্বদর্শন, অঞ্জন তার প্রথম সূত্র। আমার স্ত্রী নাসরিন তখন অন্তঃসত্ত্বা। উনি তখন এক মাস ঢাকায় থাকেন তো দুই মাস থাকেন বাবার বাড়িতে। বাসা খালি পড়ে থাকে। অঞ্জনকে প্রস্তাব দিলাম, আমার বাসায় এসে থাকতে। অঞ্জনও রাজি হয়ে গেল।
আমার বাড়িতে আসার পর অঞ্জনের আরেক প্রতিভা আবিষ্কার করলাম। সেটা হলো রান্না। এত ভালো রান্নার হাত আমি আমার জীবনে খুব কম দেখেছি। সে বছর খুব বড় বড় ইলিশ পড়েছিল পদ্মায়। ওর কাছ থেকে ভালো ইলিশ এবং মন্দ ইলিশ চেনা শিখেছি। ইলিশ কাটা নিয়েও ওর ছিল ভীষণ খুতখুতানি। কেমন করে ইলিশ কাটতে হবে, কাটার লোককে সেই নির্দেশনা সে নিজেই দিত। একদিনের কথা মনে আছে, মাছ কাটার লোকটা কাটতে গিয়ে সামান্য ভুল করে ফেলে, এই নিয়ে অঞ্জনের কী রাগ!
সে সময় প্রায় টানা ছয় মাস আমরা একসঙ্গে ছিলাম। আমার চলচ্চিত্র নির্মাতা হয়ে ওঠার পেছনে এই ছয় মাসের ভূমিকা বিরাট। অঞ্জন পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে তিন বছর ধরে যে জ্ঞান অর্জন করে এসেছিল, মাত্র ছয় মাসে সেই জ্ঞান আমাকে দান করে গেছে। পরবর্তী সময়ে অঞ্জন শাহীন আপাকে বিয়ে-থা করে থিতু হয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্রের পাঠদানকে পেশা হিসেবে নিয়েছে। এ তো গেল বন্ধু শিক্ষক অঞ্জনের কথা।
চলচ্চিত্রকার হিসেবে অঞ্জন সম্পর্কে দু–চার কথা বলতে চাই। পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটের খুব চৌকস ছাত্র ছিল অঞ্জন। তার ডিপ্লোমা ফিল্ম সে সময় পুরো ক্যাম্পাসে হইচই ফেলে দিয়েছিল। ছবিটা দেখার আমার সৌভাগ্য হয়েছিল। সে এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা। কোনোভাবেই ছবিটা স্টুডেন্ট ফিল্ম ছিল না। দক্ষ নির্মাতার ছোঁয়া ছিল ছবিটার পরতে পরতে। কাগজের ফুল নামে একটা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানিয়েছিল অঞ্জন; সেটিও বেশ চমৎকার নির্মাণ।
অঞ্জনের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মেঘমল্লার। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের রেইন কোট অবলম্বনে ছবিটি সে নির্মাণ করে। মুক্তিযুদ্ধের এমন নির্মোহ উপস্থাপনা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্থান করে নেবে যুগের পর যুগ। এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে অনন্য দিক হলো, বাংলার বর্ষাকাল। রাতের বৃষ্টি শুট করা যায় সহজেই, কিন্তু দিনের বেলায় বৃষ্টি শুট করা যে কত চ্যালেঞ্জিং, সে একমাত্র চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট মানুষেরাই জানেন। এ রকম ঘোর বর্ষার সার্থক চিত্রায়ণ বাংলা চলচ্চিত্রে বিরল।
অঞ্জনে শেষ ছবি চাঁদের অমাবস্যা। ছবিটা রিলিজ করে যেতে পারল না এই বরেণ্য চলচ্চিত্রকার। মেঘমল্লার অঞ্জনের সঙ্গে বসে দেখেছিলাম। কিন্তু চাঁদের অমাবস্যা অঞ্জনকে ছাড়াই দেখতে হবে। চিন্তা কোরো না অঞ্জন, চাঁদের অমাবস্যা দেখে তোমাকে চিঠি লিখব; আকাশের ঠিকানায়।