আজ তুরস্কের প্রখ্যাত নির্মাতা নুরি বিলগে জিলানের জন্মদিন। ১৯৫৯ সালের ২৬ জানুয়ারি তুরস্কের ইস্তাম্বুলে জন্ম নেন বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নির্মাতা। জন্মদিন উপলক্ষে জিলানের জীবন ও সিনেমা নিয়ে লিখেছেন চলচ্চিত্রকর্মী ও সংগঠক হুমায়ূন আহমেদ শ্রাবণ
তুষারপাতে চারদিকে সাদা বরফের আস্তরণ, ঠান্ডা বাতাস শোঁ শোঁ শব্দে বইছে। এর মধ্যেই সাদা কাপড়গুলো বাতাসে দোল খাচ্ছে। তীব্র শীতে বাইরে সবকিছু অদ্ভুত নিস্তব্ধ, যেন জনমানবশূন্য। জানালার কাচেও তুষার জমেছে একটু একটু। জানালার ভেতর থেকে অদ্ভুত এক নীরবতা দেখছে ছোট্ট নুরি। চারপাশ স্থবির, কিন্তু প্রকৃতির পরিবর্তনশীলতার ধীরগতির মধ্যে কী যেন খুঁজছে সে। ঋতুর পালাবদলে ছেলেটি ঘর ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে ঘাসে শুয়ে সময় কাটায়, যেখানে পিঁপড়াগুলো তার একাকিত্বের সঙ্গী। এটি কোনো সিনেমার দৃশ্য মনে হলেও এমনই ছিল হয়তো একুশ শতকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা নুরি বিলগে জিলানের শৈশব।
১৯৫৯ সালের ২৬ জানুয়ারি তীব্র শীতের সকালে জন্ম নেওয়া নুরি বিলগে জিলান ছোটবেলা থেকেই তাঁর পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ও মানুষের মধ্যে কিছু খুঁজে চলেছেন, যা তাঁকে নতুন কিছু সৃষ্টিতে অনুপ্রাণিত করবে, এমন কিছু যা চলচ্চিত্র জগৎকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনার পথে পরিচালিত করবে।
তাঁর গভীরভাবে সবকিছু দেখার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার সময়ে ফটোগ্রাফির প্রতি আগ্রহ জন্মায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটোগ্রাফি ক্লাবে যোগ দেন। তখন থেকেই ক্যামেরা হয়ে উঠে তাঁর জীবনসঙ্গী। শুরু হয় জীবনের মুহূর্তগুলো ফ্রেমবন্দী করে রাখার খেলা, যা তাঁকে পরবর্তী সময়ে নিয়ে যায় সিনেমার জগতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম স্টাডিজ কোর্স ও ফিল্ম প্রদর্শনীগুলো তাঁর সিনেমার প্রতি ভালোবাসাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
১৯৮০-এর দশকে জীবন নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে তিনি লন্ডন, ইতালি, কাঠমান্ডুসহ বিভিন্ন জায়গায় সময় কাটান। অবশেষে তুরস্কে ফিরে তিনি সামরিক সেবায় যোগ দেন। এ সময় তিনি উপলব্ধি করেন, সিনেমাই হবে তাঁর জীবনের পথ। তিনি মিমার সিনান ইউনিভার্সিটিতে সিনেমা বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। তবে ৩০ বছরের বেশি বয়স হওয়ায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বয়স্ক ছাত্র ছিলেন, তাই দ্রুত ক্যারিয়ার গড়ার জন্য দুই বছর পড়াশোনা করার পর তা ছেড়ে দেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি তাঁর বন্ধু মেহমেত এরইলমাজ পরিচালিত একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন ও পুরো কারিগরি প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি নিজে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন এবং একটি ক্যামেরা কেনেন।
১৯৯৩ সালের শেষ দিকে তিনি ‘কোজা’ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের শুটিং শুরু করেন। রাশিয়া থেকে নিয়ে আসা নেগেটিভ ও তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার কেন্দ্র টিআরটি থেকে পাওয়া মেয়াদোত্তীর্ণ স্টক ব্যবহার করে এই চলচ্চিত্র তৈরি হয়। ১৯৯৫ সালের মে মাসে এটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় ও প্রথম তুর্কি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে প্রতিযোগিতার জন্য নির্বাচিত হয়।
এরপর ‘কাসাবা’ ও ‘ক্লাউডস অব মে’ নির্মাণ করেন, যেগুলো তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন থেকে অনুপ্রাণিত। দুটি সিনেমাতেই নুরি তাঁর মা–বাবা ও কাজিন মেহমেত এমিন তোপরাককে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করান। এরপর নির্মাণ করেন ‘ডিস্ট্যান্ট’, যা তাঁর চলচ্চিত্রযাত্রায় নতুন মাত্রা যোগ করে। চলচ্চিত্রটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে একাধিক পুরস্কার পায়। এ সিনেমাটি দিয়েই নুরি জিলান চলচ্চিত্র অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। এই চলচ্চিত্রেও তাঁর কাজিন তোপরাক অভিনয় করেন। কিন্তু তিনি আঙ্কারা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল থেকে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। তোপরাকের মৃত্যু জিলানের ব্যক্তিগত ও চলচ্চিত্র–জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।
এই ঘটনার কষ্টের ভার জিলানের পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলোতে আরও তীব্রভাবে দৃশ্যমান হয়। চরিত্রগুলোর মনের মধ্যে সময়, স্মৃতি ও মৃত্যু নিয়ে গভীর বিষণ্নতা দেখা যায়। ২০০৬ সালে নির্মিত ‘ক্লাইমেট’ চলচ্চিত্রে নির্মাতা তাঁর স্ত্রী ইব্রু জিলানকে দিয়ে অভিনয় করান। পরবর্তী সময়ে স্ত্রী ইব্রু নির্মাতার সৃজনশীল কাজের সহযোগী হয়ে ওঠেন এবং প্রায় সব চিত্রনাট্যের সহলেখক হিসেবে কাজ করেছেন, যা জিলানের নির্মাণশৈলীকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর অংশগ্রহণ নির্মাতার পুরুষকেন্দ্রিক গল্পগুলোতে নারীর দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করেছে, যা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অসংগতিকে প্রশ্ন করে।
কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে একের পর এক সম্মাননা ইব্রু ও নুরিকে কাজের প্রেরণা জোগায়। ২০১১ সালে ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন আনাতোলিয়া’ কান উৎসবে গ্র্যান্ড প্রিক্স পায়। ২০১৪ সালে তাঁর ‘উইন্টার স্লিপ’ চলচ্চিত্রটি কানের সর্বোচ্চ পুরস্কার স্বর্ণ পাম জিতে নেয়।
নুরি বিলগে জিলানের শৈশবের স্মৃতি বারবার ফিরে আসে তাঁর চলচ্চিত্রে। যেমন তাঁর প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘কোজা’ (১৯৯৫) কিংবা ‘দ্য ওয়াইল্ড পিয়ার ট্রি’ (২০১৮)-এর পিঁপড়ার সঙ্গে সহাবস্থানের দৃশ্যগুলোতে।
জিলানের চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলো প্রায়ই একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন কিংবা অন্তর্গত দ্বন্দ্বে ত্রুটিপূর্ণ। তাঁরা জীবনসংগ্রামের অর্থ খুঁজতে ব্যস্ত, যা দর্শককে অস্তিত্ববাদ সম্পর্কে ভাবায়।
চলচ্চিত্রে বাতাসের বেগ, তুষারপাত, শুকনা ঘাস কিংবা গাছের পাতা, রাস্তা কিংবা পাহাড়, সবকিছুই চরিত্রের সঙ্গে মিশে দর্শকের মনে ধ্যানমগ্ন অভিজ্ঞতা তৈরি করে। ক্যামেরার ভাষাও চরিত্রগুলোর অভ্যন্তরীণ মানসিক অবস্থার প্রকাশ করে, যেখানে দীর্ঘ সময়ের আনকাট শট, স্টিল এবং ওয়াইড ফ্রেমের ব্যবহার দেখা যায়। এসব কৌশলে দর্শকের মনে একধরনের জাদুকরি ছন্দ সৃষ্টি হয়।
নুরি বিলগে জিলানের চলচ্চিত্রগুলোর সমাপ্তি হয় এক অনিশ্চিত যাত্রার মধ্য দিয়ে, যেমনটা আমাদের মানব জীবন।