দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (বিএফডিসি) তেমন কোনো শুটিং নেই। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে তা আরও কমেছে। দিনেও এফডিসিতে তেমন কাউকেই চোখে পড়ে না। রাতে বিরাজ করে সুনসান নীরবতা। সেই এফডিসিতে বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে দেখা গেল শতাধিক চলচ্চিত্র পরিচালককে। তাঁরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে কথা বলছেন।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই দল আরও বড় হচ্ছিল। মূলত চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির নির্বাচন ঘিরে এই জটলা। নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে এফডিসিতে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করার কথা থাকলেও পরিচালকদের মধ্যে দেখা গেল অস্থিরতা। হঠাৎ রাতে কেন এফডিসিতে অস্থিরতা সেই প্রসঙ্গে কথা বললেন পরিচালকেরা।
২৮ ডিসেম্বর চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির নির্বাচন। সেই নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত চলচ্চিত্র পরিচালকেরা। আগেই তাঁরা ঘোষণা করেছেন এফডিসিতেই নিয়ম মেনে ভোটকেন্দ্র হবে। সেখানেই ঘোষণা করা হবে ফলাফল। অথচ আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই পরিচালকেরা জানতে পারেন, এফডিসিতে ভোটকেন্দ্র করতে পারবেন না। এ নিয়ে সারা দিন এফডিসি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়। তবে রাত নয়টার পর হঠাৎই জানা যায়, ভোটকেন্দ্র নয়, নির্বাচন না–ও হতে পারে। এ নিয়েই মূলত অস্থিরতা বাড়তে থাকে। তৈরি হয় পক্ষ-বিপক্ষ।
দুই বছর মেয়াদি ২০২৫-২৬–এর এই নির্বাচনে দুটি প্যানেল হয়েছে। একটি প্যানেলের মহাসচিব ও সাধারণ সম্পাদক শীর্ষ দুই পদে প্রার্থী হয়েছেন শাহীন সুমন ও শাহীন কবির টুটুল। তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বী মুশফিকুর রহমান ও শাফি উদ্দিন সাফির প্যানেল।
নির্বাচন নিয়ে অস্থিরতা প্রসঙ্গে পরিচালক শাহীন সুমন রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘৫০ বছরের বেশি সময় ধরে প্রতি দুই বছর পরপর নির্বাচন হচ্ছে। এটা মূলত একটা উৎসবে পরিণত হয়েছে। এটা অরাজনৈতিক, অলাভজনক সংগঠন। দীর্ঘ এ সময়ে নির্বাচন কখনোই বাধাগ্রস্ত হয়নি। সব সরকারের আমলেই আমরা নির্বাচন করেছি। উপদেষ্টা নাহিদ সাহেব আমাদের সহযোগিতার কথা বলেছেন। সেখানে এফডিসির কিছু কর্মকর্তা আমাদের সহযোগিতা করতে চাইছেন না।’
কী ধরনের অসহযোগিতা করছেন, জানতে চাইলে এই পরিচালক আরও বলেন, ‘এটা যেহেতু কেপিআইভুক্ত এরিয়া। কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে এফডিসির এমডির ওপরই দায় পড়বে। সেই মনোভাব থেকেই নিষেধ করেছেন নির্বাচন করা যাবে না। কথা হচ্ছে, কেপিআইভুক্ত এলাকা তো এবার নতুন হয়নি। সব সময়ই ছিল। হয়তো কোনো কারণে এখন কেউ চাইছেন না ইলেকশন (নির্বাচন) হোক। আমরা এর প্রতিবাদ করেছি। চিঠি দিয়েছি। পরে আবার সংশ্লিষ্ট সবার অনুমতিও নিয়েছি। এখন তারা বলেছেন, তথ্য উপদেষ্টা নাকি না করেছেন। খোঁজখবর নিয়ে দেখেছি, এ প্রসঙ্গে উপদেষ্টা মহোদয় জানেনই না। বুঝতে পারছি, আমাদের শান্তিপূর্ণ এই নির্বাচনে কেউ বাধা দিতে চাইছেন।’
এফডিসির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) দায়িত্ব পালন করছেন ফারাহ শাম্মী। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে তাঁর মুঠোফোন নম্বরে ও হোয়াটসঅ্যাপে বেশ কয়েকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এ ছাড়া বিএফডিসির প্রশাসন ও অর্থ পরিচালক মোহাম্মদ হারুন অর রশিদকে ফোন দিলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
চলচ্চিত্র পরিচালক জাকির হোসেন রাজু, শাহ মোহম্মদ সংগ্রাম, নিয়ামুল মুক্তা, বন্ধন বিশ্বাসসহ ১০ জনের মতো পরিচালকের সঙ্গে নির্বাচন প্রসঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁরা কেউ কেউ রাত সাড়ে ১০টায় আবার এফডিসির পরিচালক সমিতির অফিসে মিটিংয়ে বসেন। একজন পরিচালক বলেন, ‘এখনো নির্বাচনের কেন্দ্রের জন্য এফডিসিতে অনুমতি পাওয়া যায়নি। কোথায় নির্বাচনের ভেন্যু, সেটাও এখনো বলা যাচ্ছে না।’
চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সামনে কথা হয় আরেক চলচ্চিত্র পরিচালকের সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করা শর্তে তিনি বলেন, ‘আপাতত নির্বাচন না হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ, নির্বাচনে স্বৈরাচার সরকারের দোসররা প্রার্থী হয়েছেন। আজ সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা ছিলেন। তাঁরা আবার এফডিসিতে ফিরে এলে তাঁদের পুনর্বাসন করা হবে। এ কারণে নির্বাচন না হলেও অবাক হওয়ার কিছু নাই। তাঁদের কোনোভাবেই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষে নই আমরা।’