অর্থনীতির উন্নয়নে অনেক পরিবর্তনের অঙ্গীকার করেছেন দেশটির নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিপর্যয়কর মূল্যস্ফীতির অবসান, শুল্ক আরোপ, বড় ধরনের কর হ্রাস, নিয়মকানুন প্রবর্তন ও সরকারের আকার—কী নেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের এজেন্ডায়।
ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করছেন, এসব অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে অর্থনীতিতে যেমন গতি আসবে, তেমনি ফিকে হয়ে যাওয়া আমেরিকান ড্রিম বা স্বপ্ন আবার রঙিন হবে। চলতি মাসের শুরুর দিকে মার আ লাগোতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন ট্রাম্প। খবর বিবিসি।
২০ জানুয়ারি শপথ নেবেন ট্রাম্প; অর্থাৎ এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তিনি এখন একরকম প্রস্তুত। কিন্তু বিশ্লেষকেরা বলছেন, এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তিনি নানা ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাধার সম্মুখীন হবেন। তাঁরা মনে করছেন, এসব অঙ্গীকার একটি আরেকটির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে সোজাসাপ্টাভাবে এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হওয়ার পথ নেই।
ট্রাম্প বারবার বলেছেন, তিনি ক্ষমতায় এলে জিনিসপত্রের দাম কমবে। কিন্তু বিশ্লেষকেরা বলছেন, তাঁর এই অঙ্গীকার বিপজ্জনক। বাজারে জিনিসপত্রের দাম কদাচিৎ কমে, অর্থনৈতিক সংকট না হলে জিনিসের দাম কমে না। মূল্যস্ফীতি তো জিনিসপত্রের দামের মানদণ্ড নয়, বরং দাম কতটা বাড়ল, তার মানদণ্ড। মূল্যস্ফীতির হার ইতিমধ্যে অনেকটা কমেছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি একেবারে কমে যাবে না।
এ ছাড়া ট্রাম্প গ্যাস ও জ্বালানির উৎপাদন বৃদ্ধির অঙ্গীকার করেছেন। তাঁর লক্ষ্য হচ্ছে, জ্বালানির দাম হ্রাস করা। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব কারণে মূল্যস্ফীতি হয় বা জ্বালানির দাম বাড়ে, সেই সব কারণের বেশির ভাগই প্রেসিডেন্টের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
হোয়াইট হাউসের কিছু নীতির কারণে জ্বালানির দামে প্রভাব পড়তে পারে ঠিক। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ট্রাম্পের অন্যান্য প্রস্তাব, যেমন কর হ্রাস, শুল্ক আরোপ ও অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির উল্টো অবনতি হতে পারে।
ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় মূল্যস্ফীতি বড় ভূমিকা পালন করেছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু বিশ্লেষকেরা বলছেন, নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প অর্থনীতির যতটা খারাপ চিত্র এঁকেছেন, বাস্তবতা অতটা খারাপ নয়। বিশেষ করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের নিরিখে পরিস্থিতি ভালোই ছিল।
নির্বাচনে জেতার পর ট্রাম্প ঠিকই তাঁর ওপর মানুষের প্রত্যাশার রাশ টানার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেছেন, জিনিসপত্রের দাম কমানো চ্যালেঞ্জিং হবে। কিন্তু ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যে অনেকে মনে করেন, ট্রাম্পের অঙ্গীকার বাস্তবায়নযোগ্য, যদিও কিছু সময় লাগতে পারে। তাঁরা মনে করেন, ট্রাম্প চুক্তি করতে পারদর্শী। ফলে তিনি এমন কিছু করতে পারেন, যাতে মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাপন সহজ হবে।
ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি করা সব পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা। চীন থেকে আমদানি করা পণ্যে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। এমনকি কানাডা, মেক্সিকো ও ডেনমার্কের মতো মিত্রদেশের পণ্যেও শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন তিনি। যদিও অনেকে মনে করেন, শুল্ক আরোপের হুমকি মূলত অন্যান্য বৃহৎ বিষয়ে আলোচনায় সুবিধা করার লক্ষ্য নেওয়া এক কৌশল, যেমন সীমান্ত নিরাপত্তা। তিনি হয়তো শেষমেশ আরও ধারাবাহিক হবেন।
ট্রাম্পের আরেকটি বড় অঙ্গীকার হলো, তিনি কর হ্রাস, বিধিবিধান শিথিল ও সরকারের আকার ছোট করার অঙ্গীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, এসব অঙ্গীকার যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা-বাণিজ্যের অর্গল খুলে দেবে।
কিন্তু বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এসব রাতারাতি করা সম্ভব সনয়। তাঁরা মনে করছেন, ট্রাম্প হয়তো সরকারের ব্যয় হ্রাস না করে বরং যেসব করছাড়ের মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে, সেগুলোর মেয়াদ বৃদ্ধি করবেন। তিনি যে সরকারি ঋণ বৃদ্ধির কথা বলেছেন, তাতে মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়তে পারে। সরকারের ক্রমবর্ধমান ঋণ নিয়ে উদ্বেগের কারণে ইতিমধ্যে বন্ডের সুদহার বেড়েছে।
ঋণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্যদের বিরোধিতার মুখে পড়বেন ট্রাম্প। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত কর হ্রাসের কারণে আগামী ১০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ আরও ৪ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার বাড়তে পারে।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প অবশ্য অঙ্গীকার করেছিলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মতো বড় ধরনের কর্মসূচিতে হাত দেবেন না। ফলে বাজেটর আকার চোট করার সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে। ইলন মাস্ক ও বিবেক রামাস্বামীর নেতৃত্বে ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট ইফিসিয়েন্সি নামে যে বিভাগ গঠিত হয়েছে, সেই বিভাগের প্রাথমিক লক্ষ্যও ছাঁটাই করা হয়েছে। যদিও আমলাতন্ত্রের আকার ছোট করা ট্রাম্পের অন্যতম লক্ষ্য ছিল।