জনগণের ওপর প্রভাব খতিয়ে না দেখেই কিছু পণ্যে মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) হার বাড়িয়েছে সরকার। আবার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা না করেই গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। বিনিয়োগের জন্য দুটি পদক্ষেপই নেতিবাচক। বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ আজ বুধবার এক সেমিনারে এ কথাগুলো বলেছেন।
একই অনুষ্ঠানে ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কারণে-অকারণে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করে। গোষ্ঠীস্বার্থে ঘন ঘন নীতির বদল করা হয়। নীতির ধারাবাহিকতার অভাবও আছে। আবার নীতি গ্রহণে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা হয় না।
‘বিনিয়োগ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে অর্থনীতিবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)। দুই ব্যবসায়ী নেতা যখন এমন বক্তব্য দেন, তখন সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান, লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী এবং বিডার হেড অব বিজনেস ডেভেলপমেন্ট নাহিয়ান রহমান। ইআরএফের সভাপতি দৌলত আক্তার মালার সভাপতিত্বে সংগঠনের রাজধানীর পুরানা পল্টনের নিজস্ব কার্যালয়ে সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক আবুল কাসেম।
এ কে আজাদ ও আবুল কাসেম খানের বক্তব্য নিয়ে তেমন কিছু বলেননি বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ। শুধু জানান, ভ্যাটের অংশ নিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা করবেন। বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য ১৯টি খাতকে চিহ্নিত করা হয়েছে উল্লেখ করে চৌধুরী আশিক বলেন, এর মধ্যে আটটির ব্যাপারে মনোযোগ দেওয়া হবে শিগগির।
বিনিয়োগ উন্নয়নের জন্য একটি কর্তৃপক্ষ থাকাই ভালো বলে মনে করেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, একটি কর্তৃপক্ষ থাকলে মানুষকে এত জায়গায় যেতে হবে না। তাঁর মতে, সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানের অনেক সম্পদ অব্যবহৃত রয়ে গেছে। এসব জায়গায় শিল্পায়ন হতে পারে। নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল করার পরিবর্তে এসব জায়গায় তা করা যায় কি না, ভাবা হচ্ছে।
মুখে উচ্চারণ না করলেও তিনি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বিডা এবং এ জাতীয় অন্যান্য সংস্থা মিলিয়ে একটা কর্তৃপক্ষ গড়ে তোলার ইঙ্গিত দেন। বলেন, বিডা গড়ে তোলা হয়েছিল সাবেক বেসরকারীকরণ কমিশন ও বিনিয়োগ বোর্ডকে এক করে।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ও হা–মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বলেন, গ্যাস সরবরাহে সিস্টেম লসের নামে ১০ শতাংশ চুরি হয়। এটি বন্ধ করা গেলে নতুন করে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির দরকার হবে না। অন্তর্বর্তী সরকারই পারে এ চুরি বন্ধ করতে। কারণ, তাদের ভোটের প্রয়োজন নেই।
বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এ কে আজাদ মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমার চিত্র তুলে ধরেন। বলেন, সব সরকারের চরিত্রই এক। বিগত সরকার বলেছিল, গ্যাসের দাম বাড়িয়ে সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন করবে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি তারা রাখেনি।
এ কে আজাদ বলেন, আগের কোম্পানির সম্প্রসারণ হচ্ছে, আধুনিকীকরণ হচ্ছে। কিন্তু নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না। তাঁর প্রশ্ন, ‘হবে কীভাবে? একজন ব্যবসায়ী মানে যেন একজন অপরাধী। ৩০ টাকার গ্যাস ৭৫ টাকা হবে বলে শোনা যাচ্ছে। এতে নাকি শিল্পে প্রভাব পড়বে না। তাই যদি হয়, আমি আমার সব কারখানা দিয়ে দিতে চাই। আপনারা চালান।’ দেশের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে বলে আশাবাদও ব্যক্ত করেন তিনি।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, দেশে কার্যকর করহার কত, তার কোনো ঠিক নেই। কেউ বলেন ১২ শতাংশ, কেউ বলেন ২৭ শতাংশ আবার কেউ বলেন ৪৮ শতাংশ। নীতির এত অসামঞ্জস্য বিশ্বের কোথাও নেই। দুর্নীতির কারণে সব খাত নষ্ট হয়ে গেছে। এসব ভেঙে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করতে হবে।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক হাফিজুর রহমান বলেন, দেশে ভ্যাট ও করের এমন ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে যে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করতে নিরুৎসাহিত হন। তিনি বলেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করলে দস্যুরা নিয়ে যায়। দোকান দিলে নিয়ে যায় চাঁদাবাজেরা। এসব অনিশ্চয়তা নিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, বিনিয়োগের পথ সুগম করতে করস্বর্গ না বানালেও একটু সুবিধা দিতে হবে, যাতে পুঁজি নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে না হয়।
লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশের সিইও মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, নতুন বিনিয়োগ আনতে দেশের বাইরে গিয়ে রোড শো করা হয়েছে। অথচ দেশের বিদ্যমান বিনিয়োগ পরিস্থিতি বোঝা ও চ্যালেঞ্জগুলো শনাক্ত করা দরকার ছিল।