দ্যা নিউ ভিশন

এপ্রিল ৫, ২০২৫ ০২:২১

পণ্য রপ্তানি ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ

চট্টগ্রাম বন্দর

পণ্য রপ্তানিতে বৈশ্বিক সমস্যার কারণে গত দুই বছরে বেশ ভুগেছে বাংলাদেশ। বিদায়ী বছরে আবার দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে পণ্য রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষও ভুগিয়েছে কয়েক মাস। এতে দেশের পণ্য রপ্তানির ধারা এখন ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

ঘটনাবহুল ২০২৪ সালে শেষ পর্যন্ত দেশের পণ্য রপ্তানিতে ইতিবাচক ধারা আছে। তবে প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পে বিভিন্ন ইস্যুতে প্রায়ই অসন্তোষ দেখা দেয়। চলতি মাসেও বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আশুলিয়ায় আন্দোলন হয়েছে। যেহেতু শ্রমিকদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের ১৮টি দাবির অনেকগুলো এখনো প্রক্রিয়াধীন, সেহেতু নতুন বছরেও শ্রম ইস্যু বড় হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

বিদায়ী বছরজুড়ে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে ভুগেছেন রপ্তানিকারকেরা। ব্যাংকঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসার খরচ বেড়েছে। ডলার–সংকট ও ডলারের উচ্চমূল্য এবং বছরের মাঝামাঝি সময়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে রপ্তানিকারকেরা সেভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণে যাননি।

পণ্য রপ্তানির পরিসংখ্যান নিয়ে বড় কেলেঙ্কারিও ফাঁস হয় চলতি বছর। ফলে রপ্তানি ফুলিয়ে–ফাঁপিয়ে বেশি দেখানো নিয়ে অনেক দিন ধরে যে অভিযোগ ছিল, তার অবসান ঘটে। তাতে পণ্য রপ্তানি একলাফে ৫৫ বিলিয়ন বা ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা থেকে কমে ৪৪ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারে নেমে আসে। যদিও ভুল পরিসংখ্যানের ওপর ভর করে চলতি বছর দুই দফায় পণ্য রপ্তানিতে নগদ সহায়তা কমিয়েছে বিদায়ী সরকার।

পোশাকশিল্প ভুগেছে, ভুগিয়েছে

কোটা সংস্কার আন্দোলন সহিংস আকার ধারণ করলে গত ১৮ জুলাই রাতে ব্রডব্র্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। তখন আমদানি ও রপ্তানিতে চরম অচলাবস্থা তৈরি হয়। পরদিন থেকে কারফিউ জারির পর অধিকাংশ শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যায়। চট্টগ্রাম বন্দরে চার দিন আমদানি–রপ্তানি বন্ধ থাকে। এতে বিশেষ করে পণ্য রপ্তানি ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়। ফলে অনেক পোশাক কারখানাকে নিজস্ব খরচে উড়োজাহাজে করে পণ্য পাঠাতে হয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে তখন বিদেশি ক্রেতারা ক্রয়াদেশ দেওয়া সাময়িকভাবে বন্ধ রাখেন। পরে অবশ্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দুই সপ্তাহ পরেই বিভিন্ন দাবিদাওয়া আদায়ে গাজীপুর ও সাভারের আশুলিয়ায় পোশাকশ্রমিকেরা রাস্তায় নামেন। সে সময় ওষুধশিল্পেও শ্রম অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকদের কর্মবিরতির কারণে দিনের পর দিন বেশ কিছু কারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ওষুধ খাতের উদ্যোক্তারা দ্রুতই শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে দাবিদাওয়া মেনে নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেন। সে কাজটি করতে পারেননি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা। একপর্যায়ে সরকারের উদ্যোগে শ্রমিকদের ১৮ দফা দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দেয় মালিকপক্ষ।

এর ফলে পোশাকশিল্পের সব কারখানার শ্রমিকদের মাসিক হাজিরা বোনাস ২২৫ টাকা বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া রাত আটটার পর বিদ্যমান টিফিন বিলের সঙ্গে বাড়তি ১০ টাকা, আর বিদ্যমান নাইট বিল ১০ টাকা বাড়ানো হয়। একই সঙ্গে নাইট বিল ন্যূনতম ১০০ টাকা করা হয়েছে। ন্যূনতম মজুরি সব কারখানায় বাস্তবায়নের পাশাপাশি ছয় মাসের মধ্যে নিম্নতম মজুরির বিধিবিধান পর্যালোচনা করা হবে। এ ছাড়া সাত সদস্যের একটি কমিটি ইতিমধ্যে শ্রমিকদের বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট স্বাভাবিক ৫ শতাংশের সঙ্গে অতিরিক্ত ৪ শতাংশ চূড়ান্ত করেছে।

ধীরে ধীরে শ্রম পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে থাকে। অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে গাজীপুর ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকার পোশাকশ্রমিকেরা বকেয়া মজুরির দাবিতে আন্দোলন করেন। বকেয়া বেতনের দাবিতে বেক্সিমকোর শ্রমিকেরা নভেম্বরে ছয় দিন গাজীপুরের চন্দ্রা-নবীনগর মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন। ওই সময় বিভিন্ন জেলায় পণ্য পরিবহনও বাধাগ্রস্ত হয়।

অন্য খাতগুলো সমান সুযোগ পায়নি

বিভিন্ন খাতের রপ্তানিকারকেরা দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকশিল্পের সমান সুযোগ-সুবিধা দাবি করে আসছেন। গত বছর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত রপ্তানিসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়, পোশাকশিল্পে দেওয়া বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স-সুবিধা রপ্তানিমুখী অন্য সব শিল্পকেও প্রদান করা হবে। এ ছাড়া পোশাকের মতো বাড়তি সুবিধা অন্যান্য খাতকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর রপ্তানি খাত নিয়ে বাংলাদেশ সম্ভাব্য যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে, সেগুলো মোকাবিলা করতে এমন সিদ্ধান্ত হয়। তবে সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়িত হয়নি। এ ছাড়া চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে উৎসে কর অর্ধেক করা হয়।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘নতুন বছরে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আসতে পারে বিশ্ববাণিজ্য পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা। ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্ববাণিজ্য ওলটপালট করে দিতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে জড়ালে তাতে রপ্তানি বাণিজ্যে প্রভাব পড়বে। পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা কমতে পারে। আর বৈশ্বিক অস্থিরতা থাকলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করাটা চ্যালেঞ্জিং হবে।

Related News

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ

ছাত্রদলের অনুষ্ঠানে শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি, ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার আশা

ছাত্রশিবির, ছাত্রদলসহ যাঁরা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন, তাঁরা ঐক্যবদ্ধভাবে আগামী