দেশে পেঁয়াজের ভান্ডার হিসেবে পরিচিত পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার মহিষাকোলা গ্রামের কৃষক নূর ইসলাম এবার চার বিঘা জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ করেছিলেন। ৯ হাজার টাকা মণ দরে বীজ (অঙ্কুরিত পেঁয়াজ) কিনেছেন তিনি। প্রতি বিঘায় সাত মণ করে বীজ লেগেছে। তাতে বীজ বাবদই তাঁর প্রতি বিঘায় ৬৩ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এ ছাড়া বিঘায় অন্যান্য খরচ লেগেছে আরও প্রায় ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি বিঘা জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজে চাষে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা।
এদিকে কৃষক নূর ইসলামের জমিতে বিঘাপ্রতি পেঁয়াজের গড় ফলন হয়েছে ৫৫ মণ। বর্তমান বাজারে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা মণ দরে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। তাতে প্রতি বিঘা জমির পেঁয়াজ বিক্রি করে তিনি ৭১ হাজার থেকে ৭২ হাজার টাকা পাচ্ছেন। অর্থাৎ বিঘায় তাঁর গড়ে লোকসান হচ্ছে প্রায় ৪২ হাজার টাকা।
ধারদেনা কইর্যা ম্যালা আশা নিয়্যা এবার পেঁয়াজের আবাদ করিছিল্যাম। আবাদের সময় পেঁয়াজের দাম খুব ভালো ছিল। তাই ভাবছিল্যাম, ভালো লাভ পাব। কিন্তু বাজারে যে ধস নামিছে, তাতে পেঁয়াজ আবাদ কইরব্যার যায়া বিরাট ধরা খায়া গেলাম।
—নূর ইসলাম, কৃষক, মহিষাকোলা গ্রাম, সাঁথিয়া উপজেলা, পাবনা।
প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে নূর ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, ‘ধারদেনা কইর্যা ম্যালা আশা নিয়্যা এবার পেঁয়াজের আবাদ করিছিল্যাম। আবাদের সময় পেঁয়াজের দাম খুব ভালো ছিল। তাই ভাবছিল্যাম, ভালো লাভ পাব। কিন্তু বাজারে যে ধস নামিছে, তাতে পেঁয়াজ আবাদ কইরব্যার যায়া বিরাট ধরা খায়া গেলাম। এখন ধারদেনা শোধ করব কীরম কইর্যা, সেই চিন্ত্যায় অস্থির হয়া আছি।’
মুড়িকাটা পেঁয়াজ নিয়ে সাঁথিয়া উপজেলার অন্য কৃষকেরাও বিপদে পড়েছেন। তাঁরা বলছেন, এবার আবাদে মণপ্রতি দুই হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে। অথচ বাজারে এখন প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা। ফলনও হয়েছে কম, বিঘায় ৫০ থেকে ৫৫ মন। গত বছরও বিঘায় গড়ে ৬০ মণের মতো ফলন হয়েছে। সব মিলিয়ে ব্যাপক লোকসানে পড়েছেন পেঁয়াজচাষিরা। এ জন্য তাঁরা ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ ও দেশি পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্যে দাবি করেছেন। কৃষকেরা সম্প্রতি ন্যায্যমূল্যের দাবিতে সড়কে পেঁয়াজ ফেলে প্রতিবাদ ও মানববন্ধন করেছেন।
উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী এবার সাঁথিয়ায় মুড়িকাটা পেঁয়াজের কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ পড়েছে ৪০ টাকা (প্রতি মণে ১ হাজার ৬০০ টাকা)। এমন হিসাবেও কৃষকদের প্রতি মণে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা লোকসান হচ্ছে।
কৃষকদের বক্তব্য, এবার বীজের দাম বেশি হওয়ায় প্রতি মণে উৎপাদন খরচ দুই হাজার টাকা বেশি পড়েছে। সার্বিকভাবে প্রতি মণে তাঁদের ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা লোকসান যাচ্ছে। কৃষকেরা জানান, এবার শুরুতে অল্প কয়েক দিন ছয় হাজার টাকার কাছাকাছি দরে পেঁয়াজ বীজ পাওয়া গেলেও পরে তা ৮ থেকে ১০ হাজার টাকায় উঠে যায়। এ ছাড়া এবার সার এবং কামলা খরচও বেড়েছে।
স্থানীয় কৃষি কার্যালয়ের তথ্য বলছে, সাঁথিয়া উপজেলায় এবার ১৬ হাজার ৬২৭ হেক্টর হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ৬২৭ হেক্টরে মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। বাকি ১৫ হাজার হেক্টরে হালি পদ্ধতির পেঁয়াজের আবাদ চলছে। এ পর্যন্ত সাঁথিয়ায় মোট আবাদ করা মুড়িকাটা পেঁয়াজের প্রায় অর্ধেক জমির তোলা হয়ে গেছে।
সরেজমিনে গতকাল শনিবার সাঁথিয়া উপজেলার পুন্ডুরিয়া ও আফরা বায়াসহ বিভিন্ন গ্রামের মাঠে গিয়ে কৃষকদের মুড়িকাটা পেঁয়াজ তুলতে দেখা যায়। বৃষ্টির কারণে এবার কিছুটা দেরিতে এই পেঁয়াজের আবাদ করেন বলে জানান তাঁরা। মৌসুমের শুরুতে জমি কিছুটা ভেজা থাকায় অনেকেরই ফলন কম হয়েছে। মাঠ থেকে উপজেলার করমজা চতুরহাট ও বোয়ালমারি হাটে গিয়েও দেখা গেছে, প্রচুর মুড়িকাটা পেঁয়াজ উঠেছে।
বোয়ালমারি হাটের আড়তদার রাজা হোসেন বলেন, ‘পেঁয়াজ বিক্রি করে কৃষকের উৎপাদন খরচ উঠছে না। তাঁরা পেঁয়াজ বিক্রি করে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরছেন। এবার পেঁয়াজের আবাদ যেমন বেশি হয়েছে, তেমনি তাঁরা একসঙ্গে বেশি বেশি পেঁয়াজ হাটে আনছেন। যে কারণে পেঁয়াজের দামে ধস দেখা দিয়েছে।’
সাঁথিয়া উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা সঞ্জীব কুমার গোস্বামী বলেন, ‘কৃষকেরা শুরুতে ৫-৬ হাজার টাকা মণ দরে পেঁয়াজের বীজ কিনলেও শেষে অনেকেই তা ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা মণ দরে কিনেছেন। এতে সব মিলিয়ে প্রতি কেজি মুড়িকাটা পেঁয়াজ উৎপাদনে গড়ে খরচ হয়েছে ৪০ টাকা। এ ছাড়া প্রতি বিঘায় যেখানে পাঁচ–ছয় মণ বীজ বপণই যথেষ্ট সেখানে কোনো কোনো কৃষক সাত-আট মণ লাগিয়েছেন। বেশি দামে অতিরিক্ত বীজ বপণের কারণে তাঁদের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। সে তুলনায় বর্তমান বাজারদর কম হওয়ায় কৃষকেরা লোকসানে পড়েছেন।’